Story

ছোটোগল্প : আল্লারাখা, লেখক : কালের লিখন, গ্রন্থ : কবিতাকল (প্রকাশিতব্য) ২০২০

ফটো ক্রেডিট - শাখোয়াত তমাল
Written by pro_noob

নিয়ম করে বউ পেটানো অভ্যাস হয়ে গেছে বাচ্চুর! সারাদিনের কাজশেষে ঘরে ফিরেই অহেতুক একটাকিছু নিয়ে বউয়ের ওপর আক্রমণ! হাতের কাছে যা পায়, তাই দিয়েই মাইর শুরু হয়! বাঁশের চাটাইয়ের বেড়ায় গোঁজা আয়না থেকে শুরু করে জলরাখা কলসির কাঁধটাও ভাঙ্গা! পাড়াপড়শি বলাবলি করে, বউটার নাকি কপালই ভাঙ্গা! ক’বছর আগের দৃশ্য ভিন্ন ছিলো। বাচ্চু কাজ থেকে ফিরেই সারাদিন সে যা-যা করতো তা নিয়ে বউয়ের সাথে গল্প করতো। বাইরে থেকেই ডাক আসতো- বানু! ও বানু! গরু তুলছস নাকি গইলে? – জানস বউ! আইজ কামলা দিছিলাম মাস্টরবারি, দুফুরে খাইতে দিছে ট্যাংরা মাছের ছালুন! কিন্তু ছালুনে কোনো নুন দেয় নাই!

নুনছাড়া ছালুন খাওয়া যায়, ক? তর রান্ধনই আমার বেশি ভালা নাগে। বানু তখন পানচিবানো ঠোঁট বাঁকা করে সোহাগি হাসি হাসে। তারপর বলে- ‘আহো তোমার পায়ে একটু গরম তেল মালিশ কইরা দেই। সারাদিন পানিতে খেতকাম কইরা আঙুলে তুমার পচন ধরতাছে!’ সেই সুখসময় এখন চৈত্রমাসের বৃষ্টির হাত থেকে বেঁচে যাওয়া আমের মুকুলের মতোই দুর্লভ। বিয়ের পরপর বাচ্চুর মা মরে যায়, সেই থেকে একা হাতে সংসার সামলে নিয়েছে বানু। বানুও ছোটকাল থেকে মাতৃহারা। সৎমায়ের সংসার থেকে মুক্তি পেয়ে নিজের একটা সংসার পেয়ে সে আনন্দে আত্মহারা। বাড়ির চারপাশে নিজহাতে লাগিয়েছে নানারকম ফলমুলের গাছ।

২টা গরু দেখতে দেখতে এখন ৮টা। ঘরভর্তি হাঁস-মুরগী। দিনমজুর বাচ্চুর কপাল ফিরেছে বানুর স্পর্শেই। একথা গ্রামের সবাই বলে। সেই বানুর কপালে এখন প্রহারের কালশিটে! বাচ্চু আর একটা বিয়ে করতে চায়! ইউনিয়ন বোর্ডের সরকারী আপা’রা জন্মনিয়ন্ত্রণের পিল থেকে শুরু করে বিবাহিত দম্পতিদের নানারকম সেবা দিয়ে থাকে। বানু একদিন মাঠকর্মী আপাকে জিজ্ঞেস করে- ‘আমিতো বরিটরি কিছু খাই না আফা! আমার পোলাপান অবে না?’ আপা কথা বলে বুঝতে চেষ্টা করে ওদের সমস্যা কোথায়। তারপর কিছু পরামর্শও দেয়। কিন্তু আজ ৩ বছরেও বানুর প্রশ্নের কোনো জবাব আসে নি- ‘আমিতো বরিটরি কিছু খাই না আফা! আমার পোলাপান অবে না?’ আপার পরামর্শে বানু একবার সদর হাসপাতালেও যায় বিলকিসের সাথে। বিলকিস সদর হাসপাতালের আয়া। বানুদের গ্রামের মেয়ে।

হাসপাতালের ডাক্তার বানুকে ওষুধ দেয়, বাচ্চুসহ টেস্ট করতে বলে নানারকম। কিন্তু বানু কিছুতেই বাচ্চুকে টেস্টের কথা বলতে পারে না। বাচ্চু বলে- ‘তর পোয়াতি হবার মুরদ নাই, মাগি! আমারে কস ডাক্তর দেখাইতে! আমি আবার বিয়া করুম!’ বানু হয়তো কিছু বলতে যায়- তখনি শুরু হয় মাইর! এভাবে মাসেরপর মাস যায়। বছর গড়ায় বানের জলের মতো। ছোট আমগাছটা বড় হয়ে ফল ধরে, বছরঘুরে বকনাবাছুরটা বড় হয়ে গর্ভবতী হয়ে আবার বাচ্চাপ্রসব করে; কিন্তু বানু আর গর্ভবতী হয় না। এখনও প্রতিসন্ধ্যায় দক্ষিণপাড়ার বাচ্চুর বউ বিলাপ করে কাঁদে, একথা গ্রামের সবাই জানে। সবাই জানে, বানু একটা বাঁজা মেয়েছেলে। তারও কিছুদিন পর, পৌষমাসের এক শীতরাতে বাচ্চু নতুন বউ নিয়ে ঘরে ফিরে। মার খেয়েখেয়ে কাহিল বানুর চোখ মুহূর্তের মধ্যে আগুনের মতো জ্বলেওঠে! বাচ্চুর ঘর ছাড়া তার যে আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই! একথা ভেবে আবার সেই চোখের আগুন দপ করে নিভেও যায়! সে এককাপড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গন্ত্যব্যহীন অন্ধকার পথে হাঁটা শুরু করে। কোথায় যাবে সে নিজেও জানে না। শুধু এটুকু জানে, আজ থেকে এই ঘর, এই হাঁস-মুরগী, গাছপালা, কাঁথা-চাদর, কালো গাই, ছোট বকনাবাছুর, বিছানা-বালিশ কোনকিছুই আর তার নয়। সীমাহীন শূন্যতা হৃদয়ে ধারণ করে, গা-কাঁপানো কনকনে শীতের রাতে এক অসহায় গ্রাম্যবধূ হেঁটে যাচ্ছে অন্ধকারে! ঘনকুয়াশা ধোঁয়াশা হয়ে মিলন ঘটিয়েছে আকাশ আর জমিনে। চারপাশে মৃত্যুর মতো নীরবতা! পাতলা একপেড়ে শাড়িতে বানুর শরীর কেঁপেকেঁপে ওঠে! বরফঠাণ্ডা বাতাস এসে কামড় বসায় তার শরীরে! মার খেয়ে জখম হওয়া জায়গাগুলো তীব্র ব্যথায় আরও টনটন করে ওঠে। যদিও শরীরের ব্যথা তখন মনের ব্যথার কাছে বড্ড ম্লান। দেহ-মনের ব্যথা একাকার হয়ে বানু প্রায় সংজ্ঞাহীন। তার শরীর একাএকাই সামনে ধেয়ে যাচ্ছে মহাশূন্য অভিযাত্রীর মতো! ঘুটঘুটে অন্ধকারে মাঝিপাড়ার বাঁশঝাড়ের পথে বানুর মনে হতে থাকে কেউ একজন তার পিছেপিছে হাঁটছে। কোনোকিছু অনুমান করার আগেই; বাঁশঝাড় পার হওয়ার আগেই; একটা বলিষ্ঠহাত বানুর মুখ চেপে ধরে! তারপর! তারপর! তারপর!

পরদিন ভোরবেলা দেখা যায়- বানু আলুথালু ঘুরে বেড়াচ্ছে পাড়াময়। সে কারও সাথে কথা বলে না। একদিন দুইদিন তিনদিন। তারপর সবাই বুঝতে পারে- বাচ্চু নতুন বউ ঘরে আনায়, বানু পাগল ও বাকহীন হয়ে গেছে! সে এখন ঘরহারা, সংসারহারা। গ্রামে ছেড়ে দেওয়া কিছু গরু থাকে, যেগুলোকে বলা হয় ‘আল্লারাখা’। এরা কারও নিজস্ব সম্পত্তি নয়, পুরো গ্রামবাসী এদের মালিক। ঈদউৎসবে জবাই করে সবাই মিলে খায়। বানুও সেই সন্ধ্যার পর আল্লারাখা গরুর মতো মালিকহীন হয়ে গেলো। তার চোখে আগুন, ঠোঁটে মরুভূমি! গলায় বোবা চিৎকার! চটপটে দুরন্ত গ্রাম্যবধূ বানু এখন সবার কাছে বানু পাগলী! তারও একবছর পর, নতুন বউয়ের সাথে বাচ্চু যাচ্ছে সদর হাসপাতালে, তার নিজের টেস্ট করাতে। নতুন বউয়ের চাপাচাপিতে হাসপাতালে যেতে আজ সে বাধ্য হয়েছে! তিনচাকার ভ্যানে গ্রামের মাটির রাস্তা পার হয়ে পাকারাস্তায় উঠতেই বাচ্চু দেখতে পায়, হবি মেম্বারের দোকানের পাশের খোলা ছাপড়া ঘরটায় বানু পাগলী বসে আছে। তার কোলে ফুটফুটে একটা শিশু!

ছবি- শাখওয়াত তমাল ।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments