Story

অপ্রত্যাশিত ভালবাসা শেষ পর্ব

Written by pro_noob

একদিন আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বই পড়ছি, তখন দেখলাম নিলয় বাসার নিচে এসে দাড়িয়ে আছে, এই ঘটনা আমার আম্মু ও দেখে ফেলে, তার বুঝতে তেমন সময় লাগলো না। আমার আম্মু খুব বকা ঝকা করে আমাকে আম্মুর বকাটাই স্বাভাবিক ছিলো। আমার যেভাবেই হোক ব্যাপার টা নিজে থেকে সামলাতে হবে। আমি নিলয় কে দেখা করার জন্য একটা ক্যাফেতে ডাকলাম। নিলয় সময়মতো সেখানে চলে আসলো। আমার মাথায় একটা জিনিস শুধু চলতেছিলো, কিভাবে এই সমস্যাটাকে বিদায় করা যায় আমার জীবন থেকে। আমি নিলয় কে বললাম দেখেন আপনি যা করতেছেন তা ঠিক না আমি এর জন্য পুলিশ এর কাছে যেতে পারি আপনি আমাকে ভয়ানক বিরক্ত করছেন আমালে সমাজ থেকে একদম আলাদা করে ফেলতেছেন, সবার কাছে আমি খারাপ হয়ে যাচ্ছি এমনকি আমার নিজের পরিবার এর কাছেও।

ছেলেটে একটা কথা ও বললো না আমার কথা খুব মন দিয়ে শুনলো আর ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে আমার হাতে দিয়ে চলে গেলো। এই ছেলেটার ভাব দেখে আমি রাগ একদম চরম সিমানায় উঠে গেলো। কাগজ টা কোন রকম ব্যাগে রেখে চলে আসলাম বাসায়। চিঠির কথা আমার মনে ছিলো না। আমার অনার্স ২য় পরিক্ষা শেষ হতেই বাসা থেকে আমার বিয়ের জন্য দেখছিলো একটা ছেলেকে আব্বু আম্মু অলরেডি পছন্দ করে ফেলেছে।আমি হ্যা না কিছুই বলিনি আমার মতামত অনেকটা নিরপেক্ষ। কলেজ বন্ধ তাই সারাদিন বাসায় থাকা হয়। এর মধ্য একদিন নিলয় এর আম্মু আমাদের বাসায় আসলো। আমাদের সাথে তাদের পরিচয় থাকলেও আমাদের বাসায় এমনি কখনো আসেন না।

আমি বাইরে থেকে দেখলাম তাদের মধ্য সিরিয়াস কিছু কথা চলতেছে। আমি তেমন কিছু বুঝলাম না। আম্মু আমাকে এসে বললো কি কান্ড করেছিস তুই মহিলা নিজেএ ছেলের জন্য তোকে বউ হিসাবে নিতে চায়। আমি শুনে পুরো আকাশ থেকে পরার মতো ভাব ধরে বললাম না আম্মু আমি কিছু জানিনা। আম্মু বললো আমি তো একবার বাসার সামনে ও দেখছি ওরে। মহিলাকে কোন মতে না করে দিয়েছি যে ছেলে নিজের বউ কে খুন করে তার কাছে মেয়ে বিয়ে দিবো নাকি! তোর আর কলেজ এ যেতে হবে না, যততাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ের তারিখ ঠিক করে ফেলবো। আমি আর কিছু বললাম না। খুব তাড়াতাড়ি আমার বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হয়ে গেলো আর মাত্র একমাস বাকি।

কিন্তু আজকাল খুব অদ্ভুদ অনূভব হচ্ছে। মনের মধ্য খুব চাপা একটা যন্ত্রণা। মাঝে মাঝে দম বন্ধ হয়ে আসে আর হট্যাৎ নিলয় এর চোখ গুলো চোখের সামনে ভেসে উঠে।কেন এমন হয় কিছুই বুঝতে পারিনা। যার সাথে আমার বয়ে হবে তাকেও ঠিক ভালোবাসতে পারছিনা। আমি কি তাহলে নিলয় কে ভালোবেসে ফেলেছি? অনেক দিন তাকে দেখিনা তাই দেখতেও ইচ্ছে হয় কিছুটা। তবুও আমি জানি নিজের সব ইচ্ছা কে মাটিচাপা দতে হবে,জীবন থেমে থাকবে না। একদিন আমার ফোন এ একটা ম্যাসেজ আসলো- “বাসার ছাদে আসো” আমি দৌড়ে গেলাম কারন আমি জানি এটা কে। ছাদে যাওয়ার পর কতদিন পর সেই চেহারা টা আবার দেখলাম। আমার ভেতরে সব অনূভুতি গুলো চেপে রেখে খুব রুক্ষ ভাবে বললাম এখানে কেন এসেছেন আপনি? আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে চলে যান।

নিলয় আমাকে বললো তুমি আমাকে অনেক মিস করছো,তাই আসছি। আমি বললাম আবোল তাবোল বলবেন না। নিলয় আমারে খুব কাছে চলে আসলো এত্ত কাছে যে আমি তার নিশ্বাস এর শব্দ শুনতে পাচ্ছি তাও তাকে আমি বাধা দিচ্ছি না, কেন দিচ্ছি না? নিলয় বললো তুমি সব জানো আর আমাকে ভালোবাসো আমি জানি, চলো আমার সাথে অনেক দুরে চলে যাবো কেউ খুজে পাবে না আমাদের। আমি একটু দুরে সরে গিয়ে বললাম এটা সম্ভব না আপনি চলে যান দয়া করে। সে আমার মাথা টা টান দিয়ে তার বুকের মধ্য চেপে ধরলো।

আমার মনে হলো আমি খুব শান্তি পাচ্ছি। একটা খুনি মানুষ এর বুকে এতটা শান্তি আমি খুজে পাবো কখনো কল্পনা করিনি। নিলয় আমাকে বললো আমক খুব ভালোবাসি তোমায় তোমার জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করবো যখন ইচ্ছা হবে চলে আসবা আমার কাছে। এই কথা বলে নিলয় চলে গেলো। এই ঘটনার ৭ দিন পার হয়ে গেলো আর আমাদের মধ্য যোগাযোগ হয় নি। কিন্তু আমি এইবার বুঝতে পারলাম যে আমি তাকে সত্যি ভালোবেসে ফেলছি। আমার কাছে এখন মানুষ টা যেমন হোক আমি তাকে ভালোবাসি।

আস্তে আস্তে একমাস পার হয়ে যাচ্ছে।কাল আমার বিয়ের দিন। আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না একদম কি করবো। জীবনে এর বড় ভুল টা কি আজ করে ফেলবো? বিয়ে ছেড়ে পালিয়ে যাবো? আমি নিলয়কে বেছে নেয়ার পর যদি সে আমাকে কখনো খুন ও করে ফেলে আমার আফসোস থাকবে না কারন আমি আমার ভালোবাসাকে বেছে নিছি। আমি সব কিছু ভেবে নিলয় কে একটা ম্যাসেজ দিলাম “আমি আসতেছি তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করো”। আম্মুকে বেশি কিছু লিখতে পারলাম না শুধু একটা কাগজে লিখলাম ” Sorry Ammu”। যার সাথে আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো তার সাথে বিয়ে হয়ে গেলে আমি কি পেতাম? তেমন কিছুই পেতাম না শুধুমাত্র একটা স্বাভাবিক জীবন।

কিন্তু নিলয় কে পেলে আমি পাবো প্রশান্তি। আমার খুব পছন্দের একটা জায়গা চারদিকে অনেক গাছপালা, ঢাকা শহরে এমন জায়গা পাওয়া একটু মুশকিল। এখানে নিলয় কে আসতে বলেছিলাম। কিন্তু এখন ও আসে নি। একটা গাছের নিচে আমি অপেক্ষা করছি। ভাবছি ও কি আসবে? না সব মিথ্যা ছিলো। না আসলেও আর ফিরে যাবনা আর। যেদিকে চোখ যায় হেটে চলে যাব। একটু পর নিলয় আসলো। ওকে দেখে অনেকটা শান্তি অনুভব হচ্ছে। এসে আমাকে বললো সরি আমি কিছু টাকা আর আমাদের থাকার জায়গা ম্যানেজ করতে গিয়েছিলাম তাই একটু দেরী হয়েছে। আমি বললাম সমস্যা নাই। দুইজন ঘাসের ওপর বসে আছি সামনে অনেক পরিচিত একটা মাঠ যেখানে অনেক বাচ্চারা খেলে।

নিলয় বললো তোমার মনে আছে আমার আগে ছোট বেলায় এদিকে খেলতাম। আমি বললাম হুম আছে। নিলয় বললো তুমি বসো আমি তোমার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি। নিলয় চলে গেলো খাবার আনতে।আমি ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করতে গিয়ে নিলয় এর দেয়া চিঠিটা আমার হাতে পড়লো। আমি চিঠিটা খুললাম চিঠিতে লিখা ছিলো- ” ছোটবেলায় আমি তোমাকে বিয়ে করার শপ্ন দেখতাম তোমাকে খুব ভালো লাগতো আমার কিন্তু কখনো বলতে পারিনাই । আমার বাবা বেশিরভাগ সময় আমাকে রুমে তালা মেরে রাখতো বন্ধ ঘরে ঠিক মতো খাবার পর্যন্ত দিতো না। কারন ছিলো পরিবারিক কিছু ঝামেল। ছোটবেলায় একবার আমার উপর হামলা করে কিছু মানুষ আমার বাবার সাথে ঝগড়া ছিলো এই জন্য তার পর থেকে বাবা তার একমাত্র ছেলেকে বাচানোর জন্য বাসার ভেতর তালা দিয়ে রাখতো।

আমি যখন বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেতাম তখন বাসা থেকে দুরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। একবার বাসা থেকে দুরে চলে যাওয়ার পর বাবা আবার খুজে এনে বন্ধ করে দেয়। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতো ছেলে নেশা করে বাজে ছেলেদের সাথে মিশে তাই ঘরে তালা দিয়ে রাখি। কিন্তু বন্ধ ঘরে তো আমি ঠিক মতো খাবার পেতাম না আর নেশা করার সামগ্রি পাবো কই? আমার একমাত্র ভরসা ছিলো আম্মু কিন্তু সেও আব্বুর কথা ছাড়া কিছু করতে পারতো না। এমন করে খুব অল্প বয়সে জোড় করে আমাকে বিয়ে দেয়। আমি এক প্রকার খুশি হই কারন এখন আমি মুক্ত জীবন পাবো। মেয়েটা খুবই হাসিখুশি আর মিষ্টি ছিলো। কিন্তু আমি তাকে কখনো ভালো বাসতে পারিনাই জানিনা কেন!

একদিন মেয়েটা তার বাবার বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হয় আর ফিরে আসে নি। আমি খোজ নিতে গেলে ওর আব্বু আম্মু আমাকে সন্দেহ করে পুলিশ এ দিয়ে দিলো। আমি তো জেলে যাওয়ার দুইদিন পর জানতে পারলাম মেয়েটি খুন হয়েছে। বিনা দোষে প্রায় দুই বছর জেল খাটলাম। দুই বছর পর আসল খুনি ধরা পরলো। মেয়েটির সাবেক প্রেমিক তাকে খুন করে এটা আদালতে প্রমানিত হয় আর আমি ছাড়া পাই। তুমি যদি আমার কথা বিশ্বাস না করে থাকো তাহলে মালিবাগ থানায় নিয়ে খোজ নিয়ে দেখতে পারো। তুমি আমাকে ভালোবাসো কিনা জানিনা কিন্তু আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তাই তোমাকে পাওয়ার জন্য এত্ত কিছু করেছি তুমি চাইলে আমাকে ঘৃনা করতে পারো”।

চিঠিটা পড়ে অজান্তেই চোখ দিয়ে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পরলো। নিলয় খাবার নিয়ে আসলো। আমি ওর সামনে গিয়ে বললাম চলো একটু হাটি ঘাসের ওপর। নিলয় খাবার গুলো রেখে আমার পাশাপাশি হাটতে লাগলো, হট্যাৎ তার একটা আংগুল আমার আংগুল কে স্পর্শ করলো। মনের অজান্তেই বলে উঠলাম “তুমি আমার জিবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া”।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments